দেশে নির্বাচন ঘিরে যে কর্মচাঞ্চল্য সাধারণত ছাপাখানাগুলোতে দেখা যায়, এবারে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। একসময় ভোট এলেই পোস্টার, লিফলেট ও ব্যানার ছাপাতে দিন-রাত ব্যস্ত থাকত প্রেসগুলো। কিন্তু এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচন কমিশনের নতুন আচরণবিধিতে পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় এবারই প্রথমবারের মতো দেশে পোস্টারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ছাপাখানা শিল্পে, যেখানে নেমে এসেছে এক ধরনের স্থবিরতা।

জেলা বিভিন্ন প্রেস মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এবার কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। আগের নির্বাচনে ভোটের দুই-তিন মাস আগেই প্রচারসামগ্রী ছাপার অর্ডারে ব্যস্ত সময় কাটত ছাপাখানাগুলোর। তবে পোস্টারবিহীন প্রচারণার কারণে এবারে সেই চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ছাপাখানা শিল্পকে পড়তে হয়েছে আর্থিক ও কর্মসংস্থান সংকটে।

ফেনী জেলা মুদ্রণশিল্প মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সমিতির আওতাভুক্ত মোট ৩৩টি ছাপাখানা রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ২৫ জন মালিকের নিজস্ব ছাপাখানার মেশিন রয়েছে।

গতকাল শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শহরের বড় বাজার এলাকার বিভিন্ন ছাপাখানায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রেসে কাজের চাপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কাজের অর্ডার না থাকায় অনেক ছাপাখানায় শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন।

তবে সব ছাপাখানায় পুরোপুরি কাজ বন্ধ নয়। কিছু প্রেসে হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ছাপার কাজ চালু রয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমেই তারা কোনোভাবে কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানান।

ইউনিক প্রেসের কর্মচারী মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, নির্বাচন এলেই আগের বছরগুলোতে ছাপাখানাগুলোতে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যেত, কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। পোস্টার নিষিদ্ধের কারণে ছাপানো বন্ধ আছে। তবে স্বল্প পরিমাণ লিফলেট ছাপানো হচ্ছে।

ইউনাইটেড প্রেসের স্বত্বাধিকারী আ.জ.ম ছালেহ দিদার বলেন, নির্বাচন এলেও সরকারের আইন অনুযায়ী পোস্টার টাঙানো নিষিদ্ধ থাকায় এবার পোস্টার ছাপানো হচ্ছে না। ফলে ছাপাখানার কাজ গত নির্বাচনগুলোর তুলনায় নেই বললেই চলে।

সবুজ প্রেসের কর্মচারী সাগর বলেন, নির্বাচনের সময়গুলোতে আমরা ব্যস্ত সময় পার করতাম। সেই সময়ে ওভারটাইম করতে হতো। তবে ওভারটাইমের কারণে আয়ের পরিমাণও ভালো হতো—যদি সাধারণ মাসে ২০ হাজার টাকা আয় হতো, নির্বাচনের সময় কাজ ও ওভারটাইম মিলিয়ে আয়ের পরিমাণ দাঁড়াত ৩০ হাজার টাকায়। কিন্তু এখন কাজ নেই, ফলে কোম্পানির নিজের আয়তেও প্রভাব পড়েছে।

ফেনী জেলা মুদ্রণশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি রাজীব নাথ বলেন, সমিতির অন্তর্ভুক্ত মোট ৩৩টি ছাপাখানা রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণত পোস্টার ছাপানোর একটি মৌসুম থাকে, তবে এবার তা নেই। যদিও এই কারণে আমাদের আয় কমেছে, কিন্তু কোনও ক্ষতি হয়নি। কারণ আমরা আগেই শুনেছি যে এবারের নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ, তাই ব্যবহৃত কাগজও আগে থেকে এনে রাখা হয়নি।

এদিকে প্রথমবারের মতো দেশে জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই নতুন পরিবেশকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা বলছেন, পোস্টারবিহীন নির্বাচন প্রচারণাকে আরও সুষ্ঠু, পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ করে তুলেছে।

নুরুল আফসার নামে নাজির রোডের স্থানীয় এক বাসিন্দা, বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে প্রার্থীদের প্রচারণার পোস্টারে পুরো শহর ভরে যেত যা শহরের সৌন্দর্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। এবার পোস্টারবিহীন নির্বাচন শহরকে অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। যদিও কাপড়ের পোস্টার কিছুটা শহরে দেখা মিলছে।

ফজলুল হক নামে এক পথচারী বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে প্রচারণার রাস্তাঘাটসহ শহরের প্রতিটি কোণজুড়ে ছড়িয়ে যেত। এবার তা নেই, তাই শহর অনেক শান্ত ও সুন্দর মনে হচ্ছে। কাপড়ের পোস্টার কম থাকলেও কোনোভাবে সমস্যা সৃষ্টি করছে না।

আয় কমেছে ‘দড়ি’ ব্যবসায়ীদের
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারবিহীন প্রচারণার কারণে দড়ির চাহিদা ব্যাপকভাবে কমেছে। নির্বাচনের সময় দড়ি মূলত পোস্টার, ব্যানার বা অন্যান্য প্রচারণামূলক উপকরণ টাঙানোর জন্য ব্যবহৃত হতো।

শহরের বড় বাজার এলাকাসহ বিভিন্ন বাজারের দড়ি বিক্রেতারা জানান, আগের নির্বাচনে আমরা প্রচুর পরিমাণে দড়ি বিক্রি করতাম, কিন্তু এবার সেই বাজার নেই। বিক্রির পরিমাণ অনেক কমে গেছে, ফলে আয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব পড়েছে।

তারা বলছেন, যদিও পোস্টারবিহীন নির্বাচন শহরকে পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ করেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের জন্য এটি কঠিন সময়।

জালাল মিয়া নামে এক দড়ি ব্যবসায়ী বলেন, সরকার পোস্টার নিষিদ্ধ করায় পোস্টারের কাজে দড়িও ব্যবহার হচ্ছে না, যার কারণে এটি আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বড় আঘাত। আয় কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে দড়ি ব্যবসা করছেন নুর নবী। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময়টা আমাদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো। কারণ এ সময়টায় আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। আগে প্রার্থীরা পোস্টার, ব্যানার টাঙাতে প্রচুর দড়ি কিনতেন, কিন্তু এবার সেই সুযোগ নেই। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় আমাদের ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়েছে।